বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ এখন বৈশ্বিক আর্থিক নীতিনির্ধারকদের মূল আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

নতুন এ প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাদের মূল দায়িত্বে কোনো বিঘ্ন ঘটাবে কিনা, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছেন বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রধানরা। খবর রয়টার্স।

পর্তুগালের সিন্ত্রার পাহাড়ি অঞ্চলে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) আয়োজিত বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেয়া নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এ বিষয়ে স্পষ্ট ঐকমত্য দেখা গেছে। তারা মনে করছেন, এআই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করলেও এটি আর্থিক বাজার, কর্মসংস্থান, ব্যাংক ঋণ, সাইবার নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বিদ্যুৎ কাঠামোর মতো খাতে মারাত্মক ও অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আর্থিক বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা উল্লেখ করেছেন, এআই এখন এমন একটি বড় বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা বর্তমানের প্রায় প্রতিটি প্রধান অর্থনৈতিক নীতি আলোচনাকে প্রভাবিত করছে। অভিবাসন প্রবণতা, বাজার তদারকি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনাগুলোয়ও এআইয়ের প্রভাবের বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে। এমনকি এ আলোচনার ভিড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের বহুল প্রতীক্ষিত প্রথম উপস্থিতির গুরুত্বও কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এআইয়ের সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়ই আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদি এ প্রযুক্তি প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি সফলতা দেখায়, তবে এটি খুব দ্রুত শ্রমবাজার ও আর্থিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে এটি যদি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে এর উন্নয়নে এখন পর্যন্ত যে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তাতে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো, এ দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত আইনি বা নীতিগত হাতিয়ার এ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হাতে নেই।

আর্থিক বাজারে স্বয়ংক্রিয় বা কম্পিউটারচালিত লেনদেনের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এরই মধ্যে বাজারের লেনদেনের একটি বড় অংশ পরিচালনা করছে, তবে উন্নত এআই এ প্রবণতাকে আরো নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, অনেক উন্নত অ্যালগরিদমগুলো দ্রুত বাজারে সম্পদের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি বা বাবল তৈরি করতে এবং পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করে বাজারে ধস নামাতে পারে। এ অ্যালগরিদমগুলো মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে একে অন্যের সঙ্গে মিলে সম্পদের মূল্য কারসাজি করতে শিখে যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও বাড়ছে। মানুষের ক্ষেত্রে এমন কারসাজি অবৈধ হলেও মেশিনের মাধ্যমে করা হলে তা ট্র্যাক করা বা প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন।

বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোয় এআইয়ের পেছনে যেভাবে টাকা ঢালা হচ্ছে, তা এরই মধ্যে বাজারে একটি বাবল তৈরির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যেমন বিশেষায়িত সেমিকন্ডাক্টর চিপ ও ডেটা সেন্টার তৈরির পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা সাময়িকভাবে বড় দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়েছে। তবে সম্প্রতি প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের দাম কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এ বিনিয়োগের ধারাকে ইতিহাসের বড় আর্থিক বুদবুদের সঙ্গে তুলনা করছে। যেমন ১৮৪০-এর দশকের ব্রিটিশ রেলওয়ে ম্যানিয়া, বিশের দশকের শেয়ারবাজার বুমিং ও নব্বই দশকের শেষের দিকের ডট-কম বুদবুদ। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (বিআইএস) জানিয়েছে, বর্তমান এআই বিনিয়োগের গতি ও পরিধি অতীতের এ ঘটনাগুলোর সঙ্গেই মেলে, যা নিকট ভবিষ্যতে বাজারে বড় পতনের ঝুঁকি নির্দেশ করছে।

ব্যাংকিং ও ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও এআইয়ের কারণে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন উন্নত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গ্রাহকদের ঋণ ঝুঁকি আরো নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করতে পারবে। ফলে অতীতে যারা প্রথাগত ব্যাংকিং সেবা থেকে বাদ পড়েছিলেন, এমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও সহজে ঋণ পাবেন। তবে আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের জন্য এ নতুন ঋণ পদ্ধতির তদারকি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। উন্নত সিস্টেমের মাধ্যমে নেয়া সিদ্ধান্তগুলোকে প্রায়ই একটি ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা রহস্যময় প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করা হয়। যার অর্থ হলো কোনো ঋণ কেন অনুমোদিত বা প্রত্যাখ্যান করা হলো, তার পেছনের সুনির্দিষ্ট যৌক্তিক কারণ মানব তদারককারীদের পক্ষে সহজে ব্যাখ্যা করা বা অডিট করা সম্ভব হয় না।

এ প্রযুক্তি ধনী ও অনুন্নত দেশগুলোর মধ্যে এবং বড় করপোরেশন ও ছোট ব্যবসার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি হওয়া নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা হুমকি থেকে বাঁচতে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। ফলে ছোট কিন্তু লাভজনক ব্যবসাগুলো আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে করা ক্ষতিকর সাইবার আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হিমশিম খাবে। এ সমস্যা মোকাবেলায় কিছু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা একটি সমন্বিত বীমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন, যা অনেকটা প্রচলিত ব্যাংক আমানত বীমার মতো কাজ করবে। ফলে যদি কোনো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের সাইবার বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়, তবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে তার মৌলিক কাজগুলো চালিয়ে নিতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকাররা মনে করছেন, বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থাকে এ নজিরবিহীন কাঠামোগত পরিবর্তন থেকে রক্ষা করতে হলে আগামী দিনগুলোয় বেশ সতর্কতার সঙ্গে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

আরও